• Saturday, 31 October 2026
Home / Detail News Copy Link
আটিয়া বন আইন: জনস্বার্থ বিরোধী নাকি শালবন রক্ষার শেষ প্রহরী?

টাঙ্গাইল: সম্প্রতি টাঙ্গাইলের সখীপুরে বন বিভাগের পুরোনো স্থাপনাসমূহ উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে ‘আটিয়া বন (সংরক্ষণ) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে আইনটির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকলেও, পরিবেশবিদ ও বনাঞ্চল বিশেষজ্ঞরা এটিকে টাঙ্গাইল ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের শালবন রক্ষার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন।

বিষয়টিকে নিছক ‘বন বনাম মানুষ’ হিসেবে না দেখে, এর পেছনের জটিল ভূমি ব্যবস্থা, রেকর্ড অসামঞ্জস্যতা এবং পরিবেশগত বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার দাবি উঠে এসেছে।

আটিয়া বনের ইতিহাস ও আইনি জটিলতা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের ফরেস্ট অ্যাক্টের আওতায় ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জুড়ে প্রায় ৫৯,৬৪৮ একর জমি আটিয়া সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে স্বাধীনতা পরবর্তীতে ১৯৭৫-৮৫ সালের দিয়ারা জরিপে বনের বহু জমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়ে যাওয়ায় ভূমির সত্যতা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে এই আইনি অনিশ্চয়তা কাটাতে ১৯৮২ সালে ‘আটিয়া ফরেস্ট (প্রোটেকশন) অর্ডিন্যান্স’ জারি করে সরকার।

জনমানুষের ক্ষোভের কারণ

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যুগের পর যুগ বসবাস করা সত্ত্বেও ভূমি রেকর্ডের অসামঞ্জস্যতার কারণে তারা নতুন ঘরবাড়ি সংস্কার বা নির্মাণ করতে পারছেন না। ফলে জনপ্রতিনিধিদের পক্ষে এই দাবির সমর্থনে দাঁড়ানোটা স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিক্রিয়া।

তবে টাঙ্গাইল বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে এই বনাঞ্চলের প্রায় ৪৬ শতাংশ জমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আইন শিথিল করা হলে কেবল সাধারণ দরিদ্র মানুষই নন, বরং প্রভাবশালী দখলদাররাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

বিশেষজ্ঞ মতামত ও টেকসই সমাধানের পথ

ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান এর মতে, কৃত্রিম বনায়ন কখনো শতবর্ষী প্রাকৃতিক শালবনের বাস্তুতন্ত্রের (Ecosystem) বিকল্প হতে পারে না। ফলে এই বন রক্ষা করা সার্বিক জনস্বার্থেরই অংশ।

সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞ সমাজ নিচের পদক্ষেপগুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন:

ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ: আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে বনভূমির নিখুঁত সীমানা নির্ধারণ।

প্রকৃত ভূমিমালিকের অধিকার ফেরত: যাদের কাছে বৈধ কাগজপত্র ও সঠিক দলিল রয়েছে, তাদের জমি চিহ্নিত করে প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা।

মানবিক পুনর্বাসন: দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ও দরিদ্র মানুষদের সামাজিক বনায়ন বা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা।

নতুন দখল বন্ধে কঠোরতা: সংরক্ষিত বনে নতুন করে যেকোনো অবৈধ দখল শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতির মাধ্যমে বন্ধ করা।

প্রাকৃতিক শালবন একবার ধ্বংস হলে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। তাই রাজনৈতিক উত্তাপ ও সংঘাতের পথ ছেড়ে স্বচ্ছ ভূমি-রেকর্ড, পরিবেশ বিজ্ঞান এবং আইনের শাসনের সমন্বয়েই আটিয়া বনের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।

Popular News
Trending News