• Saturday, 31 October 2026
Home / Detail News Copy Link
দেয়াঙ পাহাড়: ইতিহাস, সংকট ও অবরুদ্ধ বন্যহাতির গল্প

কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দাঁড়িয়ে থাকা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দেয়াঙ পাহাড় কেবল একটি প্রাকৃতিক ভূখণ্ড নয়; এটি হাজার বছরের ইতিহাস, কৃষ্টি এবং বাস্তুতন্ত্রের এক জীবন্ত দলিল। তবে আধুনিক শিল্পায়ন, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং মানুষের জবরদখলের নির্মম চাপে আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শত শত বছরের প্রাচীন এই পাহাড়। একই সাথে বনের আয়তন সংকুচিত হয়ে পড়ায় সেখানে জন্ম নেওয়া ও বাস করা কয়েকটি অবরুদ্ধ বন্যহাতি এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র সংঘাত।

সম্প্রতি দেয়াঙ পাহাড়ের ইতিহাস, বর্তমান সংকট ও হাতির ওপর চলা অমানবিক নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত পরিবেশ ও সামাজিক গবেষক সৈয়দ মামুনূর রশীদ।

ইতিহাসের প্রাচীন সমাহার

দেয়াঙ পাহাড়ের ভাজেই লুকিয়ে আছে চট্টগ্রামের হাজার বছরের নানা পট পরিবর্তন। ইবনে বতুতা, চীনের পরিব্রাজক হিউয়েন সাং, আরব বণিক, পর্তুগিজ নাবিক থেকে শুরু করে কবি আলাওলের ইতিহাস বিজড়িত এই ভূমি। হযরত মোহছেন আউলিয়া (র.) ও বদরশাহ্ (র.)-এর স্মৃতিধন্য এই পাহাড়ে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম সাধকদের সাধনার নিদর্শন রয়েছে। ১৯২৭ সালে এখানকার ঝিওরি ও হাজীগাঁও সীমান্তে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া ৬৬টি পিতলের বুদ্ধমূর্তি এর প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে।

কিন্তু ব্রিটিশ আমলের জাহাজ নিয়ন্ত্রণ অফিসের ধ্বংসাবশেষ ও মরিয়ম আশ্রমের মতো প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের বদলে গত কয়েক দশকে সেখানে গড়ে উঠেছে শিল্পাঞ্চল (কেইপিজেড), বসতি ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো।

‘করিডর’ হারিয়ে অবরুদ্ধ দেয়াঙের শেষ প্রহরীরা

দেয়াঙ পাহাড়ের অন্যতম বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বন্যহাতির প্রাকৃতিক চলাচলের পথ বা করিডর (Corridor) হারিয়ে যাওয়ার পর।

প্রজন্মের স্মৃতির পথ: চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে শুরু করে বাঁশখালী, লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও সাঙ্গু নদী পেরিয়ে দেয়াঙ পাহাড় হয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বন্যহাতির বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক করিডর। মানবজাতি ভুললেও হাতি তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনুসৃত পথ ভোলে না।

বর্তমান করুণ চিত্র: বর্তমানে দেয়াঙ পাহাড়ে দুটি হাতি আটকা পড়ে আছে। তন্মধ্যে একটি হাতির শুঁড় গত বছর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ায় মারাত্মক অসুস্থ এবং অন্যটি বয়স্ক।

নির্যাতন ও উসকানি: বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্যহাতি উত্যক্ত করা বা আঘাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণীর অসাধু চক্র স্থানীয়দের উসকে দেওয়া ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘টিকটকার’দের দিয়ে কুকুর লেলিয়ে ও আগুন ছুড়ে হাতি দুটিকে আতঙ্কিত করছে।

বনের রক্ষাকবচ ও পরিবেশগত সমাধান

বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, দেয়াঙ পাহাড়ের বাকি বনটুকু ধ্বংসের হাত থেকে টিকিয়ে রাখার পেছনে হাতি দুটিই মূলত ‘শেষ রক্ষাকবচ’ হিসেবে কাজ করছে। হাতি সরিয়ে দেওয়া হলে অবশিষ্ট পাহাড় ও বনভূমি নিমিষেই ভুমিদস্যুদের পেটে চলে যাবে এবং কালক্রমে স্থানীয় অধিবাসীদের নিজেদের ভিটেমাটিও হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

গবেষকদের সুপারিশকৃত সমাধানসমূহ:

১. জরুরি সুরক্ষা ও বেড়া: সৌরবিদ্যুৎ চালিত নিরাপদ বেড়া (Solar Fencing) ও কুইক রেসপন্স টিম গঠন করে মানুষ-হাতি সংঘাত কমানো।

২. মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে বনায়ন: হাতির পর্যাপ্ত খাদ্য সুনিশ্চিত করতে বনের খালি জায়গায় দ্রুত বর্ধনশীল ও ঘন 'মিয়াওয়াকি' (Miyawaki) বন গড়ে তোলা।

৩. বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল: অবশিষ্ট দেয়াঙ পাহাড়কে ‘বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল’ এবং প্রয়োজনে ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা।

Popular News
Trending News