• Saturday, 31 October 2026
Home / Detail News Copy Link
ফরেস্ট্রি ডিপ্লোমাধারীদের ১০ম গ্রেড ও প্রশাসনিক উদাসীনতা: অধিকারবঞ্চনা ও মাঠপর্যায়ের হতাশায় সংকটে বন সংরক্ষণ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সার্বিক বনজ সম্পদ রক্ষা, টেকসই বনায়ন এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় মূল কারিগরি কারিগর ও চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেন ফরেস্ট্রি ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অথচ রাষ্ট্রীয় প্রায় সকল দপ্তরে সমমানের ডিপ্লোমাধারী প্রকৌশলী ও কারিগরি পদের কর্মীরা ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে মর্যাদা পেলেও, সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও দীর্ঘস্থায়ী পদমর্যাদার চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে ১৫তম গ্রেডের স্কেলে দিনাতিপাত করছেন বন অধিদপ্তরের ফরেস্ট্রি ডিপ্লোমাধারীরা। উচ্চ আদালতের স্পষ্ট রায় ও নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন ধরে তা বাস্তবায়নে বন অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক অনীহা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা আজ মাঠপর্যায়ে নজিরবিহীন ক্ষোভ, বিষাদ ও চরম হতাশার জন্ম দিয়েছে।

জাতীয় বেতন স্কেল ও সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে তাকালে এই বৈষম্যের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা (কৃষি ডিপ্লোমাধারী), উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং) কিংবা বিভিন্ন দপ্তরের সমমানের কারিগরি ডিপ্লোমাধারীরা বহু আগেই সরকারি প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের আদেশে ১০ম গ্রেডে (দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদা) উন্নীত হয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ৪ বছর মেয়াদী যেকোনো কারিগরি ডিপ্লোমাকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের পদের সমতুল্য গণ্য করে ১০ম গ্রেড প্রদান করা রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত। অথচ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত এই গুরুত্বপূর্ণ ডিপ্লোমাধারীদের পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল দশকের পর দশক আটকে রাখা হয়েছে ১৫তম গ্রেডে।

আইনি পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ফরেস্ট্রি ডিপ্লোমাধারীরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল তাঁদের অনুকূলে স্পষ্ট রায় ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আদালতের রায় যেখানে চূড়ান্ত আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, সেখানে বন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহলের ভূমিকা চরম নিরাশার। অন্যান্য সরকারি দপ্তর যেখানে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনি অধিকার ও বেতন বৈষম্য নিরসনে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সেখানে বন অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন প্রশাসনের এই অনাগ্রহ, ফাইলবন্দি মানসিকতা ও নির্লিপ্ততা মূলত উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা এবং দপ্তরের নিজস্ব কাঠামোগত দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বনকর্মীদের দায়িত্ব ও ঝুঁকি অন্য যেকোনো দপ্তরের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সশস্ত্র বনদস্যু, অবৈধ দখলদার, কাঠপাচারকারী ও ভূমিগ্রাসীদের বিরুদ্ধে দুর্গম পাহাড়, গভীর সুন্দরবন কিংবা উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ চরাঞ্চলে নিজের জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয় এই ডিপ্লোমাধারী ফরেস্টার ও পদস্থদের। অথচ একদিকে জীবনের ঝুঁকি, আধুনিক সরঞ্জাম ও সুবিধার অভাব, আর অন্যদিকে সমমানের অন্যান্য ডিপ্লোমাধারী বন্ধুদের ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে মর্যাদা লাভ— এই দুইয়ের বৈপরীত্যে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা চরম হীনমন্যতা ও মানসিক চাপে ভুগছেন।

উচ্চতর প্রশাসনকে উপলব্ধি করতে হবে— অনুৎসাহিত, ক্ষুব্ধ ও অধিকারবঞ্চিত একটি জনবল দিয়ে বন ও পরিবেশ রক্ষার মতো সংবেদনশীল ও কঠিন দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। কাজের প্রতি স্বাভাবিক স্পৃহা ও উদ্দীপনা হারিয়ে গেলে তার প্রত্যক্ষ ও ক্ষতিকর প্রভাব গিয়ে পড়ে বনাঞ্চল সংরক্ষণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান, মামলা পরিচালনা ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ওপর। 'Business as Usual' বা পুরনো আমলাতান্ত্রিক শিথিলতা দিয়ে পরিবর্তনশীল জলবায়ু ও বনাঞ্চল রক্ষা করা স্রেফ অসম্ভব।

উচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করে ফরেস্ট্রি ডিপ্লোমাধারীদের অবিলম্বে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করার দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা বন অধিদপ্তরের আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাথে জরুরি সমন্বয় করে প্রবিধানমালা সংশোধন পূর্বক এই দীর্ঘদিনের বৈষম্যের দ্রুত নিরসন ঘটাতে হবে। মাঠপর্যায়ের কারিগরদের ক্ষোভ ও হতাশা নিরসন না করে, তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে সুন্দর বনাঞ্চল কিংবা গর্বিত বন বিভাগের স্বপ্ন দেখা স্রেফ অলিক কল্পনামাত্র।

Popular News
Trending News