• Wednesday, 16 September 2026
Home / Detail News Copy Link
আইন ও সদিচ্ছার মুখোমুখি বন ও পরিবেশনীতি: জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক জবাবদিহির ভারসাম্য

অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান

ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

২০ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশে নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনের অভাব নেই। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইন বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক চাপ, সুযোগসন্ধানী নীতি-দখল (Policy Capture) এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা। সরকারি বনভূমি পুনরুদ্ধার বা অবৈধ বালুমহাল বন্ধে প্রশাসন যখনই পদক্ষেপ নেয়, তখনই জনপ্রতিনিধিদের "জনগণের স্বার্থ" বা "ভোটের রাজনীতির" দোহাই দিয়ে বাধা সৃষ্টির প্রবণতা দেখা যায়।

জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর পরিবেশগত আইনের শাসন (Environmental Rule of Law) দর্শনে স্পষ্ট বলা হয়েছে—রাষ্ট্রের সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সমভাবে আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছার (Political Will) প্রকৃত পরীক্ষা সেখানে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ ও পরিবেশ সুরক্ষায় অজনপ্রিয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও রাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে কার্যকর করে।

বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠগড়া

বাংলাদেশের বর্তমান আইনি কাঠামোতে পরিবেশ সুরক্ষার সুযোগ স্পষ্টভাবে বিদ্যমান:

বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬: বনভূমি সুরক্ষা, প্রাকৃতিক বন রক্ষায় কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার মূল্যায়নের সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০: প্রতিবেশ ও জনস্বার্থের ক্ষতি হলে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারকে বালুমহাল বিলুপ্তির আইনগত দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

Forest Act, 1927: সংরক্ষিত বনে অনধিকার প্রবেশ, গাছ কাটা বা সম্পদ অপসারণ স্পষ্টত দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে রেঞ্জ অফিসার বা বিট কর্মকর্তারা অনেক সময় রাজনৈতিক চাপে একতরফা বলির পাঁঠা হন। উচ্ছেদ অভিযানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্দেশদাতা এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) নেতৃত্বে থাকলেও, রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের মুখে কেবল নিচের সারির কর্মীদের ওপর প্রশাসনিক দায় চাপানোর সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।

সংস্কারের ৫ স্তরের প্রস্তাবিত কাঠামো

পরিবেশনীতি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠে কার্যকর করতে পাঁচ স্তরের নীতিভিত্তিক সমাধান আবশ্যক:

স্তরের নামমূল কাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব

১. তথ্য ও ডিজিটাল ডাটাবেজবনভূমি, নদী ও বালুমহালের হালনাগাদ স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি।

২. আগাম সংলাপঅভিযান শুরুর আগেই জনপ্রতিনিধিদের সাথে মানচিত্র ও আইনি বিধিনিষেধ নিয়ে যৌথ বৈঠক।

৩. পেশাগত সিদ্ধান্তআইনের Operational Decision রাজনৈতিক আদেশে নয়, পেশাদার তথ্যের ভিত্তিতে গ্রহণ।

৪. প্রশাসনিক সুরক্ষানির্দেশ মান্যকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মন্ত্রণালয় কর্তৃক বদলি ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা।

৫. স্বচ্ছ জবাবদিহিআইনের হাত থেকে কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি—কাউকেই রাজনৈতিক সুবিধায় পার না দেওয়া।

নীতি-সম্পাদকের বার্তা

মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিট কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নীতি-নির্ধারণী মন্ত্রণালয় পর্যন্ত—সকলকে মনে রাখতে হবে, বনাঞ্চলের বাতাস বা নদীর মালিকানা একক কোনো গোষ্ঠীর নয়। 'Civil Service Code' ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে রাজনৈতিক নির্দেশনার ক্ষেত্রে লিখিত নথিবদ্ধকরণ এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

Popular News
Trending News