• Tuesday, 15 September 2026
Home / Detail News Copy Link
বন থাকুক, তবে স্পষ্ট বনদর্শন নিয়েই: বাংলাদেশে টেকসই বন ব্যবস্থাপনার সংকট ও উত্তরণের পথ

ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান

অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের বন নিয়ে আলোচনার সময় ‘সংরক্ষণ’, ‘বনায়ন’, ‘জীববৈচিত্র্য’, ‘জলবায়ু সহনশীলতা’ কিংবা ‘টেকসই ব্যবস্থাপনা’—এই শব্দগুলোর প্রয়োগ অহরহ চোখে পড়ে। জাতীয় বননীতি ও বন মহাপরিকল্পনাতেও টেকসই ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু সহনশীলতা, বন পুনরুদ্ধার ও জনগণের অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে মূল প্রশ্ন হলো—টেকসই বন ব্যবস্থাপনা কি সত্যিই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মূল দর্শন হয়ে উঠেছে, নাকি তা কেবল নীতি ও প্রকল্পের কাগজেই সীমাবদ্ধ?

নীতির বাস্তবায়নে ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে টেকসই বন ব্যবস্থাপনার (Sustainable Forest Management - SFM) স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যবধান বিদ্যমান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গবেষণা অনুযায়ী, নীতি বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা, তথ্য ও কাঠামোগত দুর্বলতা, বহুমাত্রিক মানবসম্পদের ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায়।

বন বিভাগকে কেবল কাঠ উৎপাদন বা বনায়ন Prescriptions-এর জায়গায় সীমাবদ্ধ না রেখে GIS, Remote Sensing, Landscape Ecology, Watershed Management ও Environmental Economics-এর মতো আধুনিক আন্তঃবিভাগীয় প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা প্রয়োজন। অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা (Bureaucratization) ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্ষমতাকে সংকুচিত করে তোলে।

প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশের বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে নিকটবর্তী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা দিতে পারে:

ভারতের বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনা (India's National Working Plan Code 2023): ভারতে বন ব্যবস্থাপনাকে সুনির্দিষ্ট Working Plan, নিয়মিত Forest Condition Monitoring, Biodiversity, Soil-Water Conservation এবং Management Effectiveness-এর সাথে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে।

নেপালের কমিউনিটি ফরেস্ট্রি (Community Forestry): নেপালের Forest Act-এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে কেবল 'অংশগ্রহণকারী' হিসেবে নয়, বরং প্রকৃত 'সহ-ব্যবস্থাপক' (Co-manager) হিসেবে আইনগত ক্ষমতা ও সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের বৃহৎ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি (Billion Trees Tsunami): রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দ্রুত বন সংস্কার সম্ভব, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলে স্থায়িত্ব পায় না।

টেকসই বন শাসন প্রতিষ্ঠায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা

বাংলাদেশে টেকসই বন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে অবিলম্বে কার্যকর ৯টি পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

SFM Implementation Framework: বিদ্যমান বননীতির সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন রূপরেখা তৈরি করা।

Ecosystem & Landscape Governance: বন বিভাগকে কেবল বনরক্ষী বা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী থেকে বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।

National Forest Information System: নিয়মিত Inventory, GIS, Remote Sensing এবং Land-use Change ট্র্যাকিংয়ের সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ গড়ে তোলা।

স্থানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা: পাহাড়, শালবন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় বনের জন্য পৃথক ও অভিযোজনশীল ব্যবস্থাপনা চালুকরণ।

জনগণের ক্ষমতায়ন: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আইনি অধিকার ও ন্যায্য লভ্যাংশ নিশ্চিতের মাধ্যমে সহ-ব্যবস্থাপক করা।

প্রকল্পনির্ভরতা হ্রাস: বিদেশি সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের অর্জিত জ্ঞান ও ডেটাবেজ বন বিভাগের স্থায়ী কাঠামোতে বাধ্যতামূলকভাবে স্থানান্তর করা।

দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি: আধুনিক বনবিজ্ঞান, জিআইএস, ক্লাইমেট সায়েন্স ও সোশ্যাল ফরেস্ট্রিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো।

সমন্বিত ভূমি ব্যবস্থাপনা: নগরায়ণ, সড়ক, কৃষি ও শিল্প পরিকল্পনায় বনের মূল্য বিবেচনায় বাধ্যতামূলক পরিবেশগত মূল্যায়নের নীতি বাস্তবায়ন করা।

ডিজিটাল সীমানা ট্র্যাকিং: বনভূমি জবরদখল ও ভূমির রূপান্তর রোধে ডিজিটাল সীমানা নির্ধারণ ও দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

Popular News
Trending News