• Wednesday, 16 September 2026
Home / Detail News Copy Link
ব্রিটিশ আমলের ‘দাস প্রথা’ বনাম আধুনিক বন বিভাগ: ইউনিফর্ম বৈষম্যে ক্ষুব্ধ মাঠ কর্মীরা
বাংলাদেশ পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা ফায়ার সার্ভিস— দেশের যেকোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর দিকে তাকালে একটি দৃশ্য চিরচেনা। বাহিনীর প্রধান থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন স্তরের কনস্টেবল বা সৈনিক, সবার গায়ে জড়িয়ে থাকে একই রঙের একই মর্যাদাশীল ইউনিফর্ম। পদের ভিন্নতা বোঝাতে কেবল যুক্ত হয় ‘র‍্যাংক ব্যাজ’। কিন্তু সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও বন্যপ্রাণী রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী ‘বাংলাদেশ বন বিভাগ’। এখানে যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক শ্রেণী বৈষম্য ও দাস প্রথার মানসিকতা, যা নিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও পুঞ্জীভূত অসন্তোষ বিরাজ করছে। মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বন বিভাগে কেবল ফরেস্ট রেঞ্জার থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন বাগান মালী পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য ইউনিফর্ম পরা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এর ওপরের স্তরের অর্থাৎ সহকারী বন সংরক্ষক (ACF), বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) কিংবা প্রধান বন সংরক্ষক (CCF) মহোদয়দের কোনো দাপ্তরিক ইউনিফর্ম নেই। মাঠের কর্মীদের অভিযোগ, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিজেদের ‘উঁচু শ্রেণী’র এবং মাঠের কর্মীদের ‘ছোট’ বা ‘দাস’ হিসেবে তুলে ধরতেই এই বৈষম্যমূলক নিয়ম আজও জিইয়ে রেখেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মাঠ কর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যেকোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর প্রধান যখন ইউনিফর্ম পরেন, তখন পুরো বাহিনীর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, সবার মধ্যে এক ধরণের উদ্দীপনা কাজ করে। কিন্তু আমাদের উর্ধ্বতন স্যারেরা স্যুট-টাই পরে এসি রুমে থাকবেন আর ছোট কর্মকর্তারা রোদ-বৃষ্টিতে ইউনিফর্ম পরে খাটবেন, এটি দেখতে অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও বৈষম্যমূলক। এই কারণেই মাঠ কর্মীদের মধ্যে ইউনিফর্ম পরিধানে এক ধরণের অনীহা কাজ করে।" শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও এই বৈষম্য বর্তমান যুগে বেমানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফরেস্ট গার্ড জানান, "বর্তমানে একজন এসিএফ বা সিসিএফ যে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে চাকরিতে আসছেন, একজন ফরেস্ট গার্ড বা ফরেস্টারও প্রায় একই রকম অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন। মেধা বা যোগ্যতায় কেউ পিছিয়ে নেই। ইউনিফর্মে পদের ভিন্নতা অনুযায়ী র‍্যাংক ব্যাজ আলাদা হতেই পারে, কিন্তু একদল পরবে আর একদল পরবে না— এটা স্পষ্ট শ্রেণী বৈষম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।" ইউনিফর্মের এই দূরবস্থার এখানেই শেষ নয়। মাঠপর্যায়ে এর কোনো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বা একরূপতা নেই। কোথাও ইউনিফর্মের এক এক কালার, কোথাও জুতো দেওয়া হলেও মোজা দেওয়া হয় না। সঠিক তদারকি না থাকায় কেউ পোশাক পরেন, কেউ পরেন না। এর ফলে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বন কর্মী আর আনসার সদস্যদের মধ্যে পার্থক্য করতে হিমশিম খায়, যা বন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। বন গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত: পরিবেশ ও বন গবেষকদের মতে, সুন্দরবনসহ দেশের অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হলে এই শত বছরের পুরনো আমলাতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক মানসিকতার অবসান হওয়া জরুরি। মাঠপর্যায়ে সত্যিকারের শৃঙ্খলা, আধুনিকতা ও কাজের গতি ফিরিয়ে আনতে বনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত সকলের জন্য একই ধরণের ইউনিফর্ম (পদমর্যাদা ভিত্তিক ব্যাজসহ) বাধ্যতামূলক করা উচিত। পুরো মাঠ প্রশাসনকে আধুনিক যুগের উপযোগী করে ঢেলে না সাজালে এবং কর্মীদের মধ্যকার এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করতে না পারলে দেশের বনভূমি রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
Popular News
Trending News