• Wednesday, 16 September 2026
Home / Detail News Copy Link
অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পাহাড় কাটার বলি দক্ষিণ চট্টগ্রাম: সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশবিদদের হুঁশিয়ারি
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া উপজেলায় সৃষ্ট সাম্প্রতিক বন্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড ও পরিবেশ ধ্বংসের এক চরম খেসারত। আজ শনিবার (১৮ জুলাই, ২০২৬) জাতীয় প্রেস ক্লাবে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা) আয়োজিত এক তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ সব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে এর পেছনের মানবসৃষ্ট কারণগুলো সাহসের সাথে স্বীকার করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, এবারের বন্যায় লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢল এই বন্যার অন্যতম কারণ হলেও প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডই এই দুর্যোগকে আরও বেশি ভয়ংকর ও প্রলয়ংকরী করে তুলেছে। বিশেষ করে ডলু ও টঙ্কাবতী নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অতিমাত্রায় ও নিয়মবহির্ভূতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তীর দুর্বল হয়ে ভাঙন বেড়েছে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ওপর নদীর পাড় দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ এবং কাঁচাবাজার ও হাসপাতালের দূষিত বর্জ্য ফেলার কারণে নদী দুটি ভয়াবহ দূষণের শিকার হচ্ছে, যা স্থানীয় প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও কোনো ফল মেলেনি। সংবাদ সম্মেলনে আরেকটি চরম উদ্বেগের বিষয় হিসেবে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা ও নদীতে বাঁধ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বক্তারা জানান, ইটভাটার মাটির জোগান দিতে এই অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। পাহাড় প্রকৃতির প্রাকৃতিক ঢাল ও পানি ধারণক্ষমতা বজায় রাখে, যা কেটে ফেলার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে এসে পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বাড়াচ্ছে এবং নিম্নাঞ্চলে অল্প সময়ে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি করছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে নদীতে অবৈধ বাঁধ দিয়ে মাছ চাষের কারণে পানির স্বাভাবিক নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে গেছে, যা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সাথে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিবেশগত ক্ষতিকর দিকগুলো সংবাদ সম্মেলনে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়। পরিবেশবাদী সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে শতাধিক পাহাড় সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। জনবসতিপূর্ণ এলাকার মাঝ দিয়ে যখন ৫ থেকে ৭ ফুট উঁচু রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে, তখন পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলে দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। বক্তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা না করে পরিচালিত উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। সংবাদ সম্মেলন থেকে লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া অঞ্চলকে রক্ষায় কয়েকটি জরুরি দাবি পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—ডলু ও টঙ্কাবতী নদীতে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন অনতিবিলম্বে বন্ধ করা, নদীর পাড় দখলমুক্ত করা এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধে কঠোর হওয়া। এছাড়া পাহাড় কাটা ও গাছ পাচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, ফসলি জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের উর্বর মাটি) রক্ষা এবং নদীতে অবৈধ বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ বন্ধের দাবি জানানো হয়। পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে নদী-খাল পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামীতে এই অঞ্চলে আরও বড় দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন পরিবেশবিদরা।
Popular News
Trending News