• Wednesday, 16 September 2026
Home / Detail News Copy Link
সিলেটে সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধার ও কমলালেবুর বাগান অপসারণ: 'বন আইন ১৯২৭', নীতি ও বাস্তবতার নিরিখে বিশেষ বিশ্লেষণ
সম্প্রতি সিলেটে সংরক্ষিত বনভূমি (Reserved Forest) থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনাকালে বন বিভাগ কর্তৃক দখলদারদের লাগানো কমলালেবুর বাগান অপসারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনপরিসরে এক নিবিড় আইনি ও পরিবেশগত আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে দখলদার ও কতিপয় গোষ্ঠীর দাবি—গাছ কাটার ফলে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে এবং গাছ কাটা পরিবেশবিরোধী; অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বেআইনি দখলের ওপর গড়ে ওঠা ফলবাগান বা কৃষি উচ্ছেদ করা বন আইনের মূল কাঠামোরই অংশ। বিষয়টির আইনি, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক গভীরতা বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস (IFESCU)-এর অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান এক নিবন্ধে স্পষ্ট করেছেন যে, ‘গাছ কাটা বেআইনি’—এই ধারণাকে ঢালাওভাবে সংরক্ষিত বনে অবৈধ দখলের ওপর প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। বন আইন, ১৯২৭ (Forest Act, 1927)-এর আইনি প্রেক্ষাপট: বন আইন, ১৯২৭-এর মূল কথা হলো—সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এই আইনের আওতায়: ১. অনুমতি ছাড়া সংরক্ষিত বনে প্রবেশ, চাষাবাদ, দখল বা গাছ লাগানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ২. অবৈধভাবে দখল করে কমলালেবু, রাবার বা অন্য কোনো বাগান তৈরি করলেই জমির ওপর ব্যক্তির কোনো আইনি বা স্বত্বগত অধিকার জন্মায় না। ৩. আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আইনের সর্বজনীন মূলনীতি হলো—Illegal occupation cannot create legal rights (অবৈধ দখল কখনো বৈধ অধিকারের জন্ম দেয় না)। ভারত, নেপাল, ব্রাজিলসহ বিশ্বজুড়ে সংরক্ষিত বন পুনরুদ্ধারে অবৈধ কৃষি বা বাগান অপসারণের ভূরি ভূরি নজির রয়েছে। কমলাবাগান বনাম প্রাকৃতিক বনাঞ্চল: পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক মিসবাহুজ্জামান তুলে ধরেন যে, একটি একফসলি কমলালেবুর বাগান আর একটি প্রাকৃতিক বনাঞ্চল এক নয়। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা সংরক্ষিত বন হলো হাজারো প্রজাতির উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী, মাটি, জলধারা ও অণুজীবের একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem)। সেখানে কমার্শিয়াল ফলবাগান তৈরি মূলত কৃষিকাজ, যা বনের প্রাকৃতিক চরিত্র ও জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে। ফলে বনাঞ্চলকে পূর্বাবস্থায় ফেরাতে এ ধরনের অনুপ্রবেশকারী বাগান বা স্থাপনা অপসারণ আইনসংগত উচ্ছেদেরই একটি অংশ। মানবিকতা বনাম দূরদর্শী ঝুঁকি: আর্থসামাজিক কারণে দখলদারদের প্রতি মানবিক সহানুভূতি থাকতে পারে, তবে রাষ্ট্র যদি "গাছ আছে বলেই উচ্ছেদ করা যাবে না"—এমন যুক্তি গ্রহণ করে, তবে তা দেশের অবশিষ্ট সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য এক ভয়াবহ ও আত্মঘাতী নজির তৈরি করবে। এতে করে দখলদাররা প্রথমে বন দখল করবে, গাছ রোপণ করবে এবং পরবর্তীতে বৃক্ষ সুরক্ষার অজুহাতে বনভূমি স্থায়ীভাবে গ্রাস করবে। তবে আইনবিদরা স্মরণ করিয়ে দেন, উচ্ছেদ অভিযান হতে হবে পুরোপুরি স্বচ্ছ, প্রামাণ্য, আইনি আদেশের ভিত্তিতে এবং যেকোনো প্রশাসনিক অপব্যবহার থেকে মুক্ত। অবৈধ দখলকে কোনোভাবেই পুরস্কৃত করা যাবে না, আবার আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াকেও ন্যায় ও স্বচ্ছতার সাথে মেলাতে হবে।
Popular News
Trending News