সংরক্ষিত বন উচ্ছেদে প্রশাসনিক আইনি ক্ষমতা ও কর্মকর্তাদের আইনি সুরক্ষার সংকট: একটি গভীর আইনি পর্যালোচনা বিশেষ প্রতিবেদক: মাঠপর্যায়ে বন অপরাধ বা অবৈধ জবরদখলের খবর পেলেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক
সংরক্ষিত বন দখল হয়ে যাচ্ছে। কোথাও রাতারাতি গড়ে উঠছে বসতি, কোথাও চলছে অবৈধ চাষাবাদ, আবার কোথাও বনভূমির বুক চিরে নির্মিত হচ্ছে দোকানপাট, সড়ক কিংবা নানা ধরনের স্থাপনা। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা খবর পেলেই ছুটে যাচ্ছেন। সীমিত জনবল, অপ্রতুল যানবাহন ও নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তাঁরা অভিযান পরিচালনা করছেন, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করছেন, দখলমুক্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরই অনেক ক্ষেত্রে শুরু হচ্ছে আরেক যুদ্ধ—মামলা, অভিযোগ, হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং কখনো কখনো পরিকল্পিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’।
এখানেই রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি উঠে আসে—যে কর্মকর্তা রাষ্ট্রের বনভূমি রক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁর হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা কতটুকু? আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি আইনি হয়রানির শিকার হলে রাষ্ট্র তাঁর পাশে কতটা দাঁড়াচ্ছে?
এটি নিছক বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ, আইনের শাসন এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বন আইন, ১৯২৭ এখনো বন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান আইনি ভিত্তি। এই আইনের অধীনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনুপ্রবেশ, অবৈধ দখল, চাষাবাদ ও বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ কার্যক্রম অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বন কর্মকর্তাদের অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত, জব্দ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ক্ষমতাও রয়েছে। একই সঙ্গে বন আইন সরকারকে বন কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারণে বিধি প্রণয়নের সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ আইন একদিকে বন রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রশাসনিক কাঠামোও তৈরি করেছে।
কিন্তু বাস্তব জটিলতা দেখা দেয় অন্য জায়গায়।
অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষমতা আর অবৈধ দখলদারকে উচ্ছেদ করে জমি পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা—দুটিকে এক করে দেখা যায় না।
একজন বন কর্মকর্তা কোনো সংরক্ষিত বনে অবৈধ প্রবেশ, গাছ কাটা, ফাঁদ পাতা কিংবা বন অপরাধের সরঞ্জাম জব্দ করার ক্ষেত্রে যে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন, সেটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁকে প্রতিটি পরিস্থিতিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মতো উচ্ছেদ আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয়—এমন ব্যাখ্যা আইনগতভাবে সরলীকৃত হতে পারে। বিশেষ করে কোনো স্থাপনা ভাঙা, বসতি উচ্ছেদ, দীর্ঘদিনের দখল অপসারণ কিংবা দখলদারকে আইনগতভাবে উৎখাত করার ক্ষেত্রে কোন কর্তৃপক্ষ কী প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেবে, সেটি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ভূমির আইনগত অবস্থান, দখলের প্রকৃতি, প্রযোজ্য আইন, আদালতের আদেশ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার ওপর।
এই জায়গাতেই প্রয়োজন আইনের স্পষ্টতা।
বর্তমান বাস্তবতায় বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায়ই এমন এক পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখানে তাঁদের ওপর একদিকে দ্রুত বনভূমি দখলমুক্ত করার চাপ থাকে, অন্যদিকে উচ্ছেদ অভিযানের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। ফলে একটি অভিযানের আগে কর্মকর্তাকে ভাবতে হয়—তিনি যদি অভিযান না চালান, তবে বনভূমি রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার দায় আসবে; আবার অভিযান চালালে পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে মামলা-মোকদ্দমা ও হয়রানির মুখে পড়তে হবে কি না, সেই আশঙ্কাও থাকে।
এই দ্বৈত সংকট কোনো কার্যকর বন প্রশাসনের লক্ষণ হতে পারে না।
বরং এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—কোন পরিস্থিতিতে বন কর্মকর্তা নিজ ক্ষমতায় ব্যবস্থা নিতে পারবেন, কখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা প্রয়োজন হবে, কখন পুলিশি সহায়তা বাধ্যতামূলক হবে এবং কখন আদালতের নির্দেশ প্রয়োজন হবে—এসব বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট, লিখিত ও বাস্তবসম্মত প্রটোকল তৈরি করা।
বন রক্ষার আইন যদি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য না হয়, তবে সেই আইন কেবল কাগজে শক্তিশালী হয়ে থাকবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কর্মকর্তাদের আইনি সুরক্ষা।
বন আইন, ১৯২৭-এর ৭৩ ধারায় বন কর্মকর্তাদের সরকারি কর্মচারী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। একই আইনের ৭৪ ধারায় সরল বিশ্বাসে আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সুরক্ষার বিধান রয়েছে। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট শর্তে আদালতে বিচারিক কার্যক্রম গ্রহণের আগে প্রাথমিক অনুসন্ধান ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের বিষয়টি বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারায় নির্দিষ্ট শ্রেণির সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বা দায়িত্ব পালনের দাবি করে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে আদালত কর্তৃক cognizance গ্রহণের আগে সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টও এই বিধানের উদ্দেশ্য হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের অযথা হয়রানি থেকে সুরক্ষার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছে। তবে এই সুরক্ষা সর্বজনীন দায়মুক্তি নয় এবং এটি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য কোনো কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করে না।
অতএব, প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—বন কর্মকর্তাদের কি আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হবে?
প্রশ্নটি হওয়া উচিত—সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো কর্মকর্তা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, আবার একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারও যেন বাধাগ্রস্ত না হয়—রাষ্ট্র কি সেই ভারসাম্যপূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে?
আমাদের উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়।
কারণ বাস্তবে একজন বন কর্মকর্তা কোনো দখলদারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করার পর যদি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে ছুটতে হয়, নিজের পয়সায় আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়, কিংবা সরকারি দায়িত্বের প্রতিটি পদক্ষেপের ব্যাখ্যা তাঁকেই একা দিতে হয়, তবে এটি শুধু একজন কর্মকর্তার সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
সরকারি অভিযানের সিদ্ধান্ত যদি রাষ্ট্রের হয়, তবে তার আইনগত প্রতিরক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের হওয়া উচিত।
এখানে বন বিভাগের নিজস্ব লিগ্যাল সাপোর্ট সেল বা বিশেষায়িত আইনি সহায়তা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো বন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মামলার আসামি হলে, প্রাথমিক পর্যায়েই বিভাগীয় আইন কর্মকর্তা বা রাষ্ট্রীয় আইনজীবীর সহায়তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি উচ্ছেদ অভিযানের আগে ও পরে ভিডিও রেকর্ডিং, জিপিএস-ভিত্তিক অবস্থান, জমির নথি, দখলের ছবি, পঞ্চনামা, উপস্থিত সাক্ষী এবং অভিযানের লিখিত আদেশ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
প্রযুক্তি এখানে কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় আইনি ঢাল হতে পারে।
কারণ আজকের দিনে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’-এর সবচেয়ে কার্যকর জবাব হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। অভিযান যদি ক্যামেরায় ধারণ করা থাকে, জমির অবস্থান যদি ডিজিটাল ম্যাপে সংরক্ষিত থাকে, দখলদারকে নোটিশ বা আইনগত প্রক্রিয়ার নথি যদি অনলাইনে সংরক্ষিত থাকে, তাহলে মিথ্যা অভিযোগের সুযোগ অনেকটাই কমে আসে।
তবে একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বন উচ্ছেদ অভিযানও যেন আইনের বাইরে না যায়। কোনো কর্মকর্তা যেন ব্যক্তিগত ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব বা মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে কারও বৈধ সম্পত্তি বা অধিকার ক্ষুণ্ন না করেন। কারণ আইনের শাসনের মূলনীতি হলো—বন রক্ষার নামে আইন ভাঙা যাবে না; আবার আইনের জটিলতার অজুহাতে বন দখলদারদেরও ছাড় দেওয়া যাবে না।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই হলো সুশাসন।
তাই এখন সময় এসেছে বনভূমি দখলমুক্ত করার জন্য একটি সমন্বিত উচ্ছেদ নীতিমালা প্রণয়নের। সেখানে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে—
প্রথমত, সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধ দখল শনাক্ত হলে বিট কর্মকর্তা থেকে প্রধান বন সংরক্ষক পর্যন্ত কে কোন পর্যায়ে কী ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, কোন ধরনের অবৈধ স্থাপনা বা দখল বন বিভাগের নিজস্ব ক্ষমতায় অপসারণযোগ্য এবং কোন ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের সহায়তা বাধ্যতামূলক।
তৃতীয়ত, উচ্ছেদ অভিযানে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তা পাওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘রেসপন্স প্রটোকল’ থাকতে হবে।
চতুর্থত, সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলে দ্রুত আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকতে হবে।
পঞ্চমত, দায়িত্ব পালনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, বনভূমি দখলমুক্ত করার পর সেটি যাতে পুনরায় দখল না হয়, সেজন্য পুনরুদ্ধারকৃত জমির ডিজিটাল রেকর্ড, সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করতে হবে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বন রক্ষার দায়িত্ব শুধু বন বিভাগের নয়।
একটি সংরক্ষিত বন উচ্ছেদ করতে গেলে বন কর্মকর্তা একা পারবেন না। জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ভূমি প্রশাসন এবং স্থানীয় সরকার—সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন। বন বিভাগের কর্মকর্তাকে সামনে রেখে প্রশাসনের অন্য অংশ যদি নেপথ্যে থাকে, তাহলে কোনো উচ্ছেদ অভিযানই দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বাংলাদেশের বনভূমি শুধু গাছের সমষ্টি নয়। এটি দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ। তাই বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে, মামলা দিয়ে বা অপপ্রচার চালিয়ে যদি আইন প্রয়োগ থেকে পিছিয়ে দেওয়া যায়, তবে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরই।
তবে সেই সঙ্গে এটিও সত্য—কোনো কর্মকর্তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না।
প্রয়োজন এমন একটি আইনি কাঠামো, যেখানে সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পাবেন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, আর ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তা থাকবেন জবাবদিহির আওতায়।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই সংরক্ষিত বন রক্ষা করতে চায়, তাহলে শুধু উচ্ছেদের নির্দেশ দিলেই হবে না; উচ্ছেদ পরিচালনাকারী কর্মকর্তার হাতে দিতে হবে স্পষ্ট আইনি ক্ষমতা, নির্ধারিত প্রক্রিয়া এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা।
কারণ যে রাষ্ট্র তার বন রক্ষাকারী কর্মকর্তাকে আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত বন দখলদারদেরই শক্তিশালী করে।
এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—আমরা কি বন রক্ষার জন্য আইনকে শক্তিশালী করব, নাকি আইনের অস্পষ্টতার সুযোগে বনভূমি দখলের পথ আরও প্রশস্ত হতে দেব?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বন বিভাগের নয়; এটি রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রতি আমাদের সামগ্রিক অঙ্গীকারের প্রশ্ন।