• Wednesday, 16 September 2026
Home / Detail News Copy Link
বাঘ বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবন: বিশ্ব বাঘ দিবসে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

আজ ২৯ জুলাই—আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আয়োজিত আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে ২৯ জুলাইকে বাঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বজুড়ে বাঘের বিলুপ্তি রোধ ও এদের প্রাকৃতিক বাসস্থান রক্ষা করা। বাঘ কেবল একটি মহিমান্বিত বন্যপ্রাণী নয়; এটি বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার মূল নিয়ামক (Apex Predator)। বাঘ বাঁচলে টিকে থাকে বন, আর বন টিকলে সুরক্ষিত থাকে উপকূল ও জলবায়ু।  

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত: সঙ্কটের মুখে বনের রাজা

এক শতাব্দী আগেও এশিয়ার প্রাকৃতিক বনাঞ্চলগুলোতে প্রায় ১ লাখ wild tiger মুক্তভাবে বিচরণ করত। মানবজাতির অবিবেচক কর্মকাণ্ড, বন উজাড় এবং অবৈধ শিকারের কারণে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৫,৫০০ থেকে ৫,৬০০-র ঘরে।  

বাসস্থান সংকোচন: বাঘ তাদের ঐতিহাসিক বাসস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশ এলাকা হারিয়ে ফেলেছে।  

প্রজাতির বিলুপ্তি: বিগত ৭০ বছরে বাঘের ৯টি উপপ্রজাতির মধ্যে ৩টি (কাস্পিয়ান, জাভান ও বালি টাইগার) পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।  

বৈশ্বিক উদ্যোগের সাফল্য ও চ্যালেঞ্জ: ২০১০ সালের 'Tx2' (বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য) উদ্যোগের ফলে ভারত ও নেপালের মতো দেশে বাঘের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে বাঘের অস্তিত্ব এখনও চরম ঝুঁকিতে।

বাংলাদেশের চিত্র: আশার আলো, তবে শঙ্কা কাটেনি

বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক বাঘের আবাসস্থল হলো বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেওয়া সুরক্ষা পদক্ষেপের কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে।  

জরিপ বছরবাঘের আনুমানিক সংখ্যা (বাংলাদেশ অংশ)তথ্যসূত্র / পদ্ধতি

২০১৫-১০৬ টিক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ

২০১৮-১১৪ টিক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ

সাম্প্রতিক জরিপ-১২৫ টিক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ

স্মার্ট প্যাট্রোলিং, ড্রোন নজরদারি এবং হরিণ ও বাঘ শিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের কারণে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তবে বাস্তব চিত্র এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।  

মূল সংকটগুলো:

জলবায়ু পরিবর্তন ও সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের নিচু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।

অবৈধ শিকার ও চোরাচালান: আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের নজর এখনও সুন্দরবনের বাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর রয়ে গেছে।

মানুষ-বাঘ দ্বন্দ্ব: বনের সীমানা সংলগ্ন লোকালয়ে মাঝে মাঝে বাঘ চলে আসা এবং বন ওপর নির্ভরশীল মানুষের ওপর আক্রমণের ঝুঁকি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আমাদের করণীয়: জাতীয় অঙ্গীকার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল, যা প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে দেশকে রক্ষা করে। আর এই সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখার মূল কারিগর হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাঘ রক্ষায় আমাদের যা করা জরুরি:  

১. কঠোর আইন প্রয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহার: বন বিভাগে স্মার্ট টহল বৃদ্ধি ও ড্রোন পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা এবং শিকারীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা।

২. মিঠা পানির আধার সৃষ্টি: সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ খাল ও পুকুর সংস্কার করে বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য সুপেয় পানির সংস্থান নিশ্চিত করা।

৩. লোকালয়ের মানুষের বিকল্প জীবিকা: সুন্দরবনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বনাঞ্চল সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

৪. আঞ্চলিক সহযোগিতা: ভারত ও বাংলাদেশের সুন্দরবন অংশকে একটি একক বাস্তুতন্ত্র ধরে যৌথ সংরক্ষণ উদ্যোগ জোরদার করা।  

বাঘ সংরক্ষণ কেবল বন্যপ্রাণী ভালোবাসার বিষয় নয়—এটি বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা ও জাতীয় অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক: রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রাখতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা।  

Popular News
Trending News