• Tuesday, 15 September 2026
Home / Detail News Copy Link
প্রকৃতির পুনর্জন্মের সংকেত ও চকরিয়া সুন্দরবন ইতিহাস

কক্সবাজারের ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ২১,০০০ একরের ‘চকরিয়া সুন্দরবন’ কি আবার তাঁর হারানো গৌরব ফিরে পাবে? অবহেলা, চিংড়িঘেরের আগ্রাসন, লবণ মাঠ ও বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক আশার আলো দেখছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান সম্প্রতি এক বিস্তৃত গবেষণামূলক ও তাত্পর্যপূর্ণ বিশ্লেষণে চকরিয়া সুন্দরবনের পরিবেশগত সম্ভাবনা ও পুনর্জন্মের সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পথরেখা তুলে ধরেছেন।

অধ্যাপক মিসবাহুজ্জামানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চকরিয়া সুন্দরবন হারিয়ে যাওয়ার গল্পটি কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের গল্প নয়, বরং এটি মানবসৃষ্ট রূপান্তরের ফলাফল। তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য (Hydrology) ও প্রাকৃতিক প্রাক-শর্তসমূহ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে চকরিয়া আবার জেগে উঠতে পারে।

চকরিয়া সুন্দরবনের ইতিহাস ও ধ্বংসে মানবসৃষ্ট কারণ

গবেষণাপত্রের নথি অনুযায়ী, একসময় মাতামুহুরী নদীর জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল এই বনের প্রাথমিক বিস্তৃতি ছিল প্রায় ১৮,২০০ হেক্টর। তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ডাটা ও ভূ-উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়:

১৯৭২ সাল: চকরিয়া বনের প্রায় ৬৪.২% এলাকা ঘন ম্যানগ্রোভে ঢাকা ছিল।

১৯৯০-২০২০ সাল: মানবসৃষ্ট জবরদখল ও অনিয়ন্ত্রিত চিংড়ি চাষের ফলে ম্যানগ্রোভ আচ্ছাদন ১৯৯০ সালে ১২.৭%, ২০০০ সালে ৬.৪%, ২০১০ সালে ১.৯% এবং ২০২০ সালে এসে আশঙ্কাজনকভাবে মাত্র ৪.৬%-এ নেমে আসে।

বন ধ্বংসের পর সেখানে বাঁধ নির্মাণ ও জোয়ার-ভাটা অবরুদ্ধ করার ফলেই বনটির স্বাভাবিক পুনর্জন্ম বা পুনরুজ্জীবন থমকে গিয়েছিল।

কেন চকরিয়া আবার ফিরে আসতে পারে: বৈজ্ঞানিক ৫ যুক্তি

অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, Restoration Ecology-র নীতি অনুসারে ম্যানগ্রোভ বন একবার ধ্বংস হলেও উপযুক্ত পরিবেশ দিলে তা নিজে থেকেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে। চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের পক্ষে মূল পাঁচটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে:

১. পুনরুদ্ধারযোগ্য মানবসৃষ্ট ক্ষতি (Reversible Drivers): বনটি মূলত প্রাকৃতিক কারণে নয়, জমি ব্যবহারের পরিবর্তনের কারণে ধ্বংস হয়েছে— যা পরিকল্পনা পরিবর্তন করে পুনরুদ্ধার সম্ভব।

২. প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের সংকেত (Natural Regeneration): বনাঞ্চলে এখনও প্রাকৃতিক উপায়ে কেওড়া (Sonneratia apetala), বাইন (Avicennia spp.) এবং গেওড়ার চারা গজাতে দেখা যায়। এমনকি সম্প্রতি বনের পাশে টিকে থাকা একা একটি ‘সুন্দরী গাছ’ প্রকৃতির টিকে থাকার জ্যান্ত বার্তা দিচ্ছে।

৩. মাটির উপযোগিতা (Soil Suitability): চকরিয়ার মাটির কাদা ও দোআঁশ উপাদান ম্যানগ্রোভের জন্য এখনও সহায়ক।

৪. চারা রোপণ পরীক্ষণের সাফল্য (Plantation Trials): ২০১৪ ও ২০২৫ সালের গবেষণায় চকরিয়ার মাটিতে রোপণকৃত কেওড়া ও অন্যান্য চারা গাছের বেঁচে থাকা এবং কার্বন ধারণ ক্ষমতা (Carbon Sequestration) প্রমাণিত হয়েছে।

৫. জোয়ার-ভাটার জলভূমি (Tidal Wetland System): চকরিয়ার জোয়ার-ভাটার মূল চ্যানেলগুলো এখনও পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

পুনরুদ্ধারের আসল চাবিকাঠি: গাছের বদলে 'পানি ও জোয়ার-ভাটা'

গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে তা হলো— শুধু গণহারে চারা গাছ রোপণ (Plantation) করলেই প্রকৃত বন তৈরি হয় না। চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের মূল শর্ত হলো জলপ্রবাহ বা Hydrology ফিরিয়ে আনা।

প্যারাবন পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট সুপারিশসমূহ:

Hydrology-led Restoration: অপ্রয়োজনীয় বাঁধ ও ঘেরের সীমানা অপসারণ করে খালের সাথে জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ নিশ্চিত করা।

Silvo-aquaculture (সমন্বিত চিংড়ি ও বনায়ন): চিংড়ি চাষ ও বনকে প্রতিপক্ষ না বানিয়ে চিংড়িঘেরের চারপাশে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা, যা পাতা পচনের মাধ্যমে চিংড়ির প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতেও সহায়তা করে।

Restoration Zoning: প্রথমে সুরক্ষিত করা (Protect), তারপর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় পুনরুদ্ধার করা (Restore), এবং সর্বশেষে প্রয়োজন সাপেক্ষে চারা রোপণ করা (Plant)।

‘Restoration Observatory’ গঠন: মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য, কার্বন মজুদ ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য চকরিয়ায় একটি দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা।

জনসম্পৃক্ততা (Co-management): স্থানীয় জেলে, চিংড়িচাষি ও সাধারণ জনগণকে বনের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা।

সাম্প্রতিক আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ:

উল্লেখ্য, চকরিয়া সুন্দরবন রক্ষায় ২০২৬ সালে নতুন করে জাতীয় ও আইনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিগত ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হাইকোর্ট চকরিয়া সুন্দরবনের সুরক্ষা, দখলদারিত্ব উচ্ছেদ এবং প্রায় ২১,০২০ একর সংরক্ষিত/প্রস্তাবিত বনাঞ্চল সুরক্ষায় কেন সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হবে না— সে বিষয়ে রুল জারি করেছেন।

একই সাথে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেও চকরিয়া সুন্দরবনের জবরদখল ও ইজারা বাতিল করে প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। যদি জোয়ার-ভাটার পথ খুলে দেওয়া যায় এবং সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়, তবে প্রযুক্তি ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে চকরিয়া সুন্দরবন আবার তার পুরোনো সবুজ রূপ ফিরে পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা।

 

লেখা: অধ্যাপক: খালেদ মিসবাহুজ্জামান ইন্সটিটিউট অফ ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Popular News
Trending News